কমরেড আবদুস সাত্তার খান ছিলেন খাসজমি আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা ও কৃষক মুক্তির আজীবন যোদ্ধা । কমরেড আবদুস সাত্তার খান ১৯২৩ সালে পটুয়াখালী জেলার দশমিনা উপজেলার এক জোতদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি শ্রেণিগতভাবে সুবিধাভোগী পরিবারে জন্ম নিয়েও দাঁড়িয়েছিলেন শোষিত কৃষক শ্রেণীর পাশে। ছাত্রজীবনেই তাঁর মনে সমাজ পরিবর্তনের বীজ বপন হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদারি প্রথা এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, প্রকৃত মুক্তি আসবে না উপরের সংস্কার দিয়ে, বরং আসবে নিচের স্তরের মানুষের সংগঠিত শক্তির মাধ্যমে।
বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে কমরেড আবদুস সাত্তার খানের নাম এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তিনি ছিলেন খাসজমি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, ভূমিহীন কৃষকদের সংগঠক, এবং সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত। তাঁর জীবন ছিল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে উৎসর্গীকৃত এক দীর্ঘ পথচলা।
১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে কমরেড আবদুস সাত্তার খান সক্রিয়ভাবে কৃষক সংগঠনে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলের ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে দেন। পাকিস্তান আমলে ভূমি সংস্কারের নামে কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা চলছিল—মালিকানা পেত জমির মালিকরা, আর শ্রম দিত ভূমিহীনরা। আবদুস সাত্তার খান এই অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। তিনি ঘোষণা করলেন: “যে জমিতে কৃষক ঘাম ঝরায়, সেই জমির মালিক সে-ই হবে।”
এই দর্শন থেকেই ১৯৭০-এর দশকে কমরেড আবদুস সাত্তার খান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন (বিকেএফ)—একটি সংগঠন যা আজও কৃষক, খেতমজুর ও ভূমিহীনদের সংগ্রামের ধারক ও বাহক। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণাঞ্চলে খাসজমি আন্দোলন গড়ে ওঠে। সরকার ও জমিদারদের অব্যবহৃত জমি ভূমিহীন কৃষকেরা দখল করে চাষাবাদ শুরু করে। এই দখলকৃত জমিতেই গড়ে ওঠে কৃষকদের স্বপ্নের সমাজ—পারস্পরিক সহযোগিতা এবং শোষণমুক্তির লক্ষে জীবনের সংগ্রাম। আন্দোলন পরবর্তীতে স্ফুলিঙ্গের মত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কমরেড আবদুস সাত্তার খান এক কিংবদন্তিতে পরিণত হন। তিনি কখনো বাহুল্য বা প্রচারের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। দমন-পীড়ন, মামলা, কারাবাস—সবকিছুই তিনি হাসিমুখে সহ্য করেছেন। কৃষকদের মাঝে কমরেড আবদুস সাত্তার খান ছিলেন “সাত্তার ভাই, সাত্তার দাদু” নামে একজন পথপ্রদর্শক, একজন পরামর্শদাতা ও একজন আশ্রয়দাতা।
কমরেড আবদুস সাত্তার খান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব হবে কৃষকের মুক্তির মধ্য দিয়েই। তাঁর রাজনীতি ছিল শ্রেণীসংগ্রামভিত্তিক—মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বলতেন, “কৃষক যদি সংগঠিত না হয়, তাহলে দেশ শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবে না।” কমরেড আবদুস সাত্তার খান আরো বলতেন, এদেশ কৃষকের দেশ, কৃষক না বাঁচলে দেশ বাঁচতে পারে না”।
কমরেড আবদুস সাত্তার খানের জীবন ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি বিলাসিতা বা ব্যক্তিগত সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। সাধারণ কৃষকদের মতোই তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, মাটির কুঁড়েঘরে থেকেছেন, ভাগাভাগি করেছেন কৃষকের দুঃখ-আনন্দ। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অমায়িক, কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান ছিল দৃঢ় ও আপসহীন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কমরেড আবদুস সাত্তার খান তাঁর ছদ্মনাম “রফিক” ব্যবহার করে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে “রফিক বাহিনী” গঠন করেন এবং পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। জেলা পর্যায়ে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত সাত সদস্যের সংগ্রাম কমিটিতে তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য। কিন্তু এই অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর যুদ্ধকালীন বীরত্ব নিয়ে কখনও অহংকার করেননি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের পরিচয়কে কখনও ব্যক্তিগত গৌরবের বিষয় মনে করেননি; বরং এটিকে জনগণের মুক্তির সংগ্রামের স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর এই বিনয়, আত্মত্যাগ ও নীরব দেশপ্রেম তাঁকে আরও মহীয়ান করে তুলেছে।
১৯৯৬ সালের ৭ নভেম্বর, এই মহান নেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের জন্য ছিল এক গভীর শূন্যতা। তবে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ আজও হাজারো কৃষক, ভূমিহীন, যুব ও ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগায়।
আজ তাঁর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে, আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এই মহান বিপ্লবীকে—যিনি নিজের শ্রেণী অবস্থান ত্যাগ করে দরিদ্র কৃষকের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যিনি দেখিয়েছিলেন কৃষক মুক্তির পথ।
কমরেড আবদুস সাত্তার খানের জীবন আমাদের শেখায়—কোনো সংগ্রামই বৃথা যায় না, যদি তা মানুষের মুক্তির জন্য হয়। তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে কৃষক তার ঘাম ও শ্রমের বিনিময়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করবে; যেখানে ভূমি থাকবে শ্রমজীবী মানুষের দখলে, শোষকের নয়।
তাঁর উত্তরসূরিরা আজও সেই পথে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে—খাসজমি দখল, খাদ্য সার্বভৌমত্ব, ও ভূমি সংস্কারের দাবিতে। কমরেড আবদুস সাত্তার খান আজ আর শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা, দর্শন ও সংগ্রামী আত্মা প্রতিটি কৃষক সংগঠনের পতাকায় আজও উড়ছে।
জয় কৃষক, জয় কমরেড আবদুস সাত্তার খান!
তাঁর সংগ্রাম চির অম্লান, তাঁর আদর্শ আমাদের পথের দিশা।