মতিউর রহমান মল্লিক, যিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার এবং সংগঠক হিসেবে পরিচিত। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে প্রেম, মানবতা, ইসলামি চেতনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলেছেন। তার কবিতা ও গানে দ্রোহ এবং ভালোবাসার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে, যা তাকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দিয়েছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি
মতিউর রহমান মল্লিক ১৯৫৪ সালের ১লা মার্চ বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুন্সি কায়েম উদ্দিন মল্লিক এবং মাতা আয়েশা বেগম। পারিবারিকভাবেই তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠেন।
শিক্ষা ও কর্মজীবন:
মতিউর রহমান মল্লিক বারুইপাড়া সিদ্দীকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাগেরহাট পি.সি. কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক, মাসিক ‘কলম’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘বিপরীত উচ্চারণ’ নামক সাহিত্য সংকলনের সম্পাদনা করেছেন। আমৃত্যু তিনি বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অবদান:
মতিউর রহমান মল্লিকের সাহিত্য সাধনার মূল ক্ষেত্র ছিল কবিতা ও সংগীত। তার কবিতা ও গানে ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্য, দেশপ্রেম, মানবতাবোধ এবং সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি সহজ-সরল শব্দচয়নে গভীর ভাব প্রকাশে পারদর্শী ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ:
নীষন্ন পাখির নীড়ে, আবর্তিত তৃণলতা, তোমার ভাষার তীক্ষ্ণ ছোরা, অনবরত বৃক্ষের গান, চিত্রল প্রজাপতি
জনপ্রিয় সংগীত:
তার লেখা ও সুর করা অসংখ্য গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
কিছু হলো:
“তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর”, “রাসুল আমার ভালোবাসা”, “পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়”, “কথায় কাজে মিল দাও আমার”, “এ আকাশ মেঘে ঢাকা রবে না”
সাংগঠনিক জীবন
মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। ১৯৭৮ সালে তিনি সমমনা সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী’। তার অনুপ্রেরণায় দেশের বিভিন্ন
স্থানে অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য মতিউর রহমান মল্লিক বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
জাতীয় সাহিত্য পরিষদ স্বর্ণপদক, কলমসেনা সাহিত্য পুরস্কার, বায়তুশ শরফ সাহিত্য পুরস্কার, কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার, প্যারিস সাহিত্য পুরস্কার (ফ্রান্স)
মৃত্যু:
এই বরেণ্য কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ২০১০ সালের ১২ই আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মতিউর রহমান মল্লিক তার কাজের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যে অবদান রেখে গেছেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার কবিতা ও গান আজও পাঠক ও শ্রোতাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।