লাভলী ইয়াসমীন বৃহত্তর গার্মেন্ট সেক্টর আন্দোলনের প্রথম সারির একজন শ্রমিক নেত্রী হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯৭১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে, ঢাকা মেটারনিটি হসপিটালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস ঢাকা জেলার কাটাসুর মোহাম্মদপুরে। পিতা সিরাজুল খালেক সিদ্দিকী এবং মাতা মারিয়াম বেগমের সন্তান লাভলী । তার পিতা ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়ীক দাঙ্গার পর লাল মাটির দেশ বীরভূম ছেড়ে নাটোরে চলে আসেন।
লাভলী ইয়াসমীন প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন মোহাম্মদপুর বাংলা মিডিয়াম স্কুলে, পরে মিরপুরের কাজীপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং শেষ পর্যন্ত ন্যাশনাল গার্লস হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
তিনি কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে, মাত্র ১২ বছর বয়সে, মিরপুরের কনকর্ড গার্মেন্টসে মেশিন হেলপার পদে। তার অসাধারণ দক্ষতা ও পরিশ্রমের ফলে তিনি ছয় মাসের মধ্যে মেশিন অপারেটর হিসেবে উন্নীত হন এবং দশ বছর ধরে কারখানায় কাজ করেন। এ গ্রেডের দক্ষ অপারেটর হিসেবে সাত বছর কাজ করার পর, তিনি সুপারভাইজার ও সর্বশেষ লাইন চিফ পদে তার কর্মজীবন শেষ করেন।
গার্মেন্টস খাতে কাজ করার সময় লাভলী শ্রমিক অধিকার নিয়ে সক্রিয় হন এবং দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিকদের গণআন্দোলন ও অধিকার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৮ সালে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর পাওয়ার পরের দিনই তিনি চাকুরিচ্যুত হন। এরপর থেকেই শুরু হয় তার জীবনের প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের কঠিন লড়াই।
লাভলী ইয়াসমীন বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, মিছিল, ধর্মঘট, রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা এবং মালিকদের দ্বারা হামলার শিকার হয়েও আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যোগদানের ফলে মিরপুরের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়, ফলে এক বছর তিনি মিরপুরের কোনো গার্মেন্টসে কাজ পাননি।
১৯৯১ সালে বন্ধুসুলভ বড়বোনের মাধ্যমে লোডস্টার গার্মেন্টসে অপারেটর পদে চাকরি পান এবং পরে সেখানেই সুপারভাইজার ও লাইন চিফ পদে প্রমোশন পান। লাভলী ইয়াসমীন খুব কম বয়স থেকেই একজন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে বিশ্বের বহু দেশে আমন্ত্রণ পেয়ে সফরে গিয়েছেন।
লাভলী ইয়াসমীন খুব কম বয়স থেকেই একজন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে পৃথিবীর বহু দেশে আমন্ত্রণ পেয়ে সফরে গিয়েছেন, যেমন ১৯৯৬সালে কানাডা সফর (একটি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের ক্যাম্পেইং প্রোগ্রামে) , আমেরিকায়( আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে বৃহত্তর ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন AFL- CIO এর প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ ও সভা, আমেরিকার পার্লামেন্ট কংগ্রেস ব্রনিয়ারের সাথে সাক্ষাৎ ও সভা, ইস্টেড ডিপার্টমেন্ট এবং লেবার ডিপার্টমেন্টের পরিচালক এন্দ্র সামাদের সাথে সভা এবং নিউইয়র্কে বৃহত্তর সংগঠন ইউনাইট ও নারী সংগঠনগুলোর সাথে মিটিং ও সেমিনার ), ইংল্যান্ডে ওয়ার্কশপ (GLI – 3rd inter national Summer School UK) , ইতালিতে( বেরগামো, মিলানো,রোম সহ ৯টি শহরে সভা ও চাইল্ড লেবার কনফারেন্সে যোগদান) , জার্মানিতে ( MLPD ‘র নারী কমিটির, কারেজ ওমেন্স কনফারেন্সে যোগদান) , অস্ট্রিয়ার ভিয়ানাতে ( এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এর কনফারেন্স, সেমিনার, মিটিং যোগদান), বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত( eudevdays,eu ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাওয়াতে প্যানেল স্পিকার হিসাবে যোগদান।), নেদারল্যান্ডে (সেমিনার), চীন সফর গোয়াংজুতে ( মিটিং) , হংকং এ (WTO সম্মেলনে রেলি, সেমিনারে যোগদান পিপুলস পক্ষে) , ফিলিপিনে( সেমিনার ফ্রিডম অফ এসোসিয়েশন, রেলি ) ( তিন বার), থাইল্যান্ডে (তিনবার ওয়ার্কশপ,সেমিনার ), মালয়েশিয়াতে (অভিবাসি শ্রমিকদের নিয়ে সেমিনার) (তিনবার), কম্বোডিয়াতে (সেমিনার), ২০০৬ সালে পাকিস্তানের করাচিতে (ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম সম্মেলনে যোগদান,এছাড়াও ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস পালন ও বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহবাস বাংলাদেশের মাটিতে স্বসম্মানে ফিরিয়ে দেয়ার দাবীতে ক্যাম্পেইন ) , নেপালে (মিটিং, সেমিনার,মেলা,কনফারেন্স, ও ওয়াল্ড সোশ্যাল ফোরামে যোগদান) ( তিনবার),
লাভলী ইয়াসমীনের সংগ্রাম ও নেতৃত্বের মাধ্যমে গার্মেন্ট সেক্টরের শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আজও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তাকে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের একটি অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।