আমেরিকার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯০ সালে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন ২১ বছর বয়সী নাসিম মঞ্জুর। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, শিকড়ের টানে তিনি নিজের দেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে তিনি ভাবতে থাকেন কীভাবে নিজের সার্থকতা ও দেশের মানুষের কল্যাণ একসাথে নিশ্চিত করা যায়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এমন কিছু করবেন যা নিজেকে আনন্দ দেবে এবং অন্যকেও উপকৃত করবে। মূল লক্ষ্য দাঁড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। শুরুতে বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। বেতন ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। তবু তিনি এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। বিদেশফেরত নাসিম শুধু অফিসের চার দেয়ালেই আটকে থাকেননি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছেন, মানুষের মনের ভাবনা বোঝার চেষ্টা করেছেন। সাধারণ মানুষের হাতে কমদামে কী ধরনের পণ্য পৌঁছানো যায়, সেটি নিয়ে হিসাব কষেছেন। নাসিম মঞ্জুরের গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, দেশের কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।
শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। বাবার প্রতিষ্ঠানে নাসিম মঞ্জুরের কাজ ছিল বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ইট, বালু ও সিমেন্ট কেনা। তিনি বলেন, “আমেরিকা থেকে এসেই রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাস্তায় ঘুরে কাজ করা অনেক কষ্টের ছিল। কিন্তু দেশেই কিছু করার অদম্য ইচ্ছা প্রেরণা দেয়। আমি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে চেয়েছি। দেশের বেকারত্ব দূর করতে চেয়েছি।” পরিশ্রমের পাশাপাশি তিনি ব্যবসায় পরিকল্পনা শুরু করেন। বাবার ব্যবসাকে বড় করার লক্ষ্যে চামড়াজাত পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে কাজ শুরু করেন। বিশ্বমানের পণ্য তৈরি করার পরিকল্পনা করেন এবং সেভাবে ব্যবসা গড়ে তোলেন। এরপর এপেক্সকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
সময় ধরে এপেক্স বড় হয়ে ওঠে এবং নাসিম মঞ্জুরের দায়িত্ব ও কর্মপরিধিও বিস্তৃত হয়। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শুধু বাবার প্রতিষ্ঠান নয়, তিনি তৈরি করেছেন এপেক্স ফার্মা লিমিটেড, গ্রে অ্যাডভারটাইজিং বাংলাদেশ, কোয়ানটাম মার্কেট রিসার্চ ও ব্লু ওশান ফুটওয়্যার। নাসিম মঞ্জুরের গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, দেশের কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক উদ্ভাবন এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।
নাসিম মঞ্জুর বলেন, “আমি ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার পর কঠোর পরিশ্রম করেছি। কথা দিয়ে কথা রাখার চেষ্টা করেছি। ব্যবসা করেছি। নতুন কর্মসংস্থান করেছি।” তিনি বাবার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান জানান এবং বলেন, “বাবার শিক্ষা ও আদর্শ ধরে চলেছি।” আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্ব তিনি বোঝেন। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও নীতি বুঝে ব্যবসার পরিকল্পনা করেন। তিনি হিসাব কষেন, এর ফলে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হতে পারে।
নিজের কল্যাণ বা বিলাসী জীবনযাপন কখনোই লক্ষ্য ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল দেশের জন্য কিছু করা। ব্যবসা করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা ও বেকারত্ব কমানো। ছোটবেলা থেকে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও, দ্বিতীয় প্রজন্মের এই ব্যবসায়ী সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে তিনি আগ্রহী। নাসিম মঞ্জুরের গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, দেশের কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক উদ্ভাবন এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।
নাসিম মঞ্জুর মনে করেন, বাংলাদেশে পাদুকা শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় বিশ্বের বড় বড় জুতা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে জুতা শিগগিরই দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে। পাশাপাশি সৃষ্ট হবে নতুন কর্মসংস্থান।
তিনি উল্লেখ করেন, “প্রায় ২০ বছর আগে তাইওয়ানের কিছু ব্যবসায়ী জুতা বানানোর প্রযুক্তি নিয়ে চীনে গিয়েছিলেন। চীনের কঠোর পরিশ্রমী মানুষ বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। এর ফলে নতুন নতুন জুতার কারখানা গড়ে উঠেছে। এখন পৃথিবীর জুতার বাজারের ৭০ শতাংশই চীনের দখলে।” নাসিম মঞ্জুর ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতকে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিযোগী হিসেবে দেখেন।
তিনি আরো বলেন, “চীনের বাজারে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে গেছে। উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাই চীনের জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বিকল্প উপায় খুঁজছে। অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ চীন থেকে ভেতরের শহরে কারখানা স্থানান্তর করছে। কিছু কোম্পানি এমন জায়গা খুঁজছে যেখানে শ্রমিকের মজুরি কম। বাংলাদেশ হতে পারে সেই সম্ভাবনাময় দেশ।” নাসিম মঞ্জুরের বিশ্লেষণ বাংলাদেশের জুতা শিল্পের সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। তিনি দেখান, সঠিক পরিকল্পনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে এই খাত দেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারে।
এপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড গত ২০ বছর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সুনামের সঙ্গে টিকে আছে। আমি চাই, প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের পণ্য গ্রহণ করুক। সর্বদা চেষ্টা করেছি যেন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারেও ছড়িয়ে পড়ে এপেক্সের পণ্য।” স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর প্রতিদিন ১০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন করা হলেও বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি জোড়া তৈরি হচ্ছে।
নাসিম মঞ্জুর বলেন, “দেশে-বিদেশে চাহিদা বাড়ছে, ফলে উৎপাদন আরও বাড়ানো হবে।” তিনি জুতাশিল্পে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার গুরুত্ব জানান। তিনি বলেন, “সরকারি কাজে গতি আনতে হবে। জুতা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুবিধাজনক জায়গা সরবরাহে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী অন্য দেশে নতুন ঠিকানা খুঁজছে। তবে কিছু উদ্যোক্তা রাজধানীর আশপাশের ইপিজেডে জায়গা পেতে আগ্রহী এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগেও এগিয়ে আসছেন।” নাসিম মঞ্জুরের বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশের জুতা শিল্পে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সরকারী সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া সেই সম্ভাবনা পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন কঠিন।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০টির বেশি রেজিস্ট্রি করা জুতার কারখানা রয়েছে। এর বাইরে আরও কিছু ছোট কারখানা আছে। নাসিম মঞ্জুর বলেন, “কারখানা বাড়াতে হবে। এ জন্য আমাদের মতো উদ্যোক্তাদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিবছর বেতন বাড়াতে হবে, না হলে শ্রমিক টিকে থাকতে পারবেন না। কিন্তু উৎপাদনশীলতা না বাড়ালে কারখানাও টিকে থাকবে না। শুধু মালিকপক্ষ দায়ী নয়, সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।”
নাসিম মঞ্জুর বলেন, উৎপাদন খরচ ও বিদ্যুৎ ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের একটি কারখানায় শুধু ডিজেল জেনারেটর চালাতে খরচ হয়েছে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। তাহলে উৎপাদনশীলতা কোথা থেকে আসবে? আপনি একটি মেশিন সেটআপ করলেন, আর দিনে ১১ বার বিদ্যুৎ গেল। এই বাড়তি খরচের প্রাথমিক দায়িত্ব অবশ্যই মালিকের।”
চামড়া শিল্পেও সমস্যার উদাহরণ টানেন তিনি। নাসিম মঞ্জুর বলেন, “বহুদিন ধরে শুনছি ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের জন্য ঠিকানা খুঁজছে। কিন্তু কত দিনে অপেক্ষা শেষ হবে, তা চামড়া ব্যবসায়ীরা জানে না। কলকাতার ট্যাংরায় চামড়াশিল্পের জন্য তৈরি করা সিইটিপি বর্তমানে কার্যত অচল। নির্মাণ পদ্ধতিতে ত্রুটি ছিল। একই সমস্যা বাংলাদেশেও হতে পারে।”
উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “এপেক্সের কারখানায় বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কাইজান ট্রেনিংয়ের আয়োজন করেছি। খরচ প্রায় নেই, কিন্তু সুফল আসে দ্রুত।” তিনি আন্তর্জাতিক সমীক্ষার উদাহরণ টানেন। সমীক্ষা অনুযায়ী, মোট পারিবারিক ব্যবসার ৭৫ শতাংশই দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছে এসে বিলুপ্ত হয়ে যায়। নাসিম বলেন, “আমেরিকায় পড়াশোনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেছিলেন, পারিবারিক ব্যবসায় নতুন কিছু করার সুযোগ থাকলে, এতে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ থাকে। আমার লক্ষ্য ছিল বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে পরিচিত করানো।”
নাসিম মঞ্জুরের বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, নতুন ধারণা গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বিশ্লেষণ ছাড়া বাংলাদেশের জুতা ও চামড়া শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। নাসিম মঞ্জুর বলেন, “১৯৯০ সালে গাজীপুরে তখন সবেমাত্র একটি জমি কেনা হয়েছিল। আমি তখন মাত্র ২১ বছর বয়সী। সেই বছরই ভারত থেকে জুতা রপ্তানি শুরু হয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, বাংলাদেশ থেকেও জুতা উৎপাদন শুরু হবে। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ডসভায় এ বিষয়ে আলোচনা করি।”
তিনি যোগ করেন, “দেশে সস্তা শ্রমিক, উন্নতমানের চামড়া এবং নিজস্ব চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা আমাদের বিশেষ সুবিধা। বাটা কোম্পানির একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। আমি পাঁচ হাজার টাকা বেতনে তার অধীনে ম্যানেজার ট্রেনিং হিসেবে কাজে যোগ দিই। আমার কাজ ছিল বিভিন্ন ইটভাটা ঘুরে ইট, বালি, সিমেন্ট কেনা। একজন আমেরিকান গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কাজটা সহজ ছিল না। বন্ধুরা যেখানে অনেক বেশি বেতনে কাজ করছিল, তবুও কখনো সেসব নিয়ে ভাবিনি। পরিশ্রম করেছি। সব সময় মনে করেছি, দেশ ছেড়ে গেলে হবে না। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।”
দেড়শ মানুষ নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ এপেক্স এডেলসির কারখানায় প্রায় ১০ হাজার কর্মী কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানিমুখী জুতার কারখানা হিসেবে পরিচিত। নাসিম মঞ্জুরের এই গল্প দেশপ্রেম, পরিশ্রম এবং উদ্যোক্তা মানসিকতার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। তার উদ্যোগ শুধু ব্যবসার সাফল্য নয়, দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।